চট্টগ্রাম থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গত সেপ্টেম্বরে ডিজেল পাঠানোর পর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও কুমিল্লা ডিপোয় দুই লাখ লিটারের বেশি ঘাটতি ধরা পড়ে। এর দায় পাইপলাইন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সিডিপিএলের বলে দাবি করছে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। এরই মধ্যে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরত-ই-ইলাহী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সিডিপিএল প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে ঘাটতি জ্বালানি তেলের দাম পরিশোধের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিডিপিএলের (চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন) জ্বালানি তেল সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর গত ১৪-১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম টার্মিনাল থেকে ফতুল্লা ডিপোয় পাঠানোর জন্য ডিজেল পাম্প করা হয়। ২২ সেপ্টেম্বর যমুনা অয়েলের ২২ ও ২৩ নম্বর ট্যাংকে তা গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ২২ নম্বর ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ৭০ লাখ ৩৮ হাজার ৪০৪ টন ও ২৩ নম্বর ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ৫০ লাখ ৫৯ হাজার ২৮২ টন হয়। ফতুল্লা ডিপোয় পাঠানো প্রথম পার্সেলে ঘাটতি হয় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ লিটার ডিজেল। অন্যদিকে কুমিল্লা ডিপোর ট্যাংকে ৩৩ হাজার ৭৫৪ লিটার পানি পাওয়া যায়। এই দুই ডিপো মিলে ঘাটতি হওয়া ২ লাখ ২৩ হাজার ৭২০ লিটার তেলের দাম পাইপলাইন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সিডিপিএলকে পরিশোধ করতে অনুরোধ জানিয়েছে যমুনা অয়েল কোম্পানি।
সিডিপিএল প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর গত ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) দেয়া এক চিঠিতে জানায়, ডিপোতে লিক ডিটেকশন সিস্টেম (এলডিএস) ও পাইপলাইন ইনট্রিউশন ডিটেকশন সিস্টেম (পিআইডিএস) চালু রেখে পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই তেল লিকেজ হওয়ার বা ঘাটতির কোনো সুযোগ নেই। ডিজেলের সঙ্গে যে পানির উপস্থিতি পরিলক্ষিত হচ্ছে তা ডিজেলের মানের ওপর নির্ভরশীল। সেজন্য ডিজেলের ঘাটতির দায়ভার সিডিপিএল নেবে না।
এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে যমুনা অয়েল ২ লাখ ২৩ হাজার লিটার ডিজেলের দাম ক্ষতিপূরণ হিসেবে চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সিডিপিএলের কাছে। ৯ নভেম্বর দেয়া চিঠিতে যমুনা অয়েল বলছে, ফতুল্লা ডিপোর ২২ ও ২৩ নম্বর ট্যাংকের জন্য ডিজেল পাঠানো হলে ফতুল্লা ডিপো ডিজেল গ্রহণ করে ৯৮ লাখ ২২ হাজার ৩৬৯ লিটার। ট্যাংক ক্যালিব্রেশন ত্রুটি বিএসটিআই থেকে সংশোধনের পর ফতুল্লা ডিপোয় পাঠানো প্রথম পার্সেলের ঘাটতি হয় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ লিটার ডিজেল। অন্যদিকে কুমিল্লা ডিপোর ট্যাংকের মধ্যে ৩৩ হাজার ৭৫৪ লিটার পানি পাওয়া যায়। মোট ঘাটতি হওয়া ২ লাখ ২৩ হাজার ৭২০ লিটার তেলের দাম পাইপলাইন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সিডিপিএলকে পরিশোধ করতে অনুরোধ করেছে। হদিস না মেলা জ্বালানির কোনো দায় নেবে না যমুনা অয়েল।
রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল চিঠিতে আরো জানায়, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন প্রকল্পের সঙ্গে তেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর প্রধান স্থাপনাসহ কুমিল্লা, গোদনাইল ও ফতুল্লা ডিপোর প্রায় ২৩টি ট্যাংকের সংযোগ রয়েছে। এসব ট্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এককভাবে সিডিপিএল/পিটিসি-পিএলসির তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ফলে তেল বিপণনকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চাইলেও কোনো ভালব খোলা বা বন্ধ করা সম্ভব নয়। তেল পরিবহনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করে সিডিপিএল। পরিবহন শুরুর আগে ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার কারণে কোথাও ফাঁকা বা ত্রুটি সৃষ্টি হয়েছে কিনা তা তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর জানার কথা নয়। অন্যদিকে যান্ত্রিক বা অপারেশনাল ত্রুটির কারণে কোনো ট্যাংকে অতিরিক্ত তেল বা পানি প্রবেশ করেছে কিনা, সেই তদারকিও করে সিডিপিএল।
এদিকে ট্যাংকে পানি পাওয়া প্রসঙ্গে যমুনা অয়েল বলছে, সিডিপিএল নির্মিত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন টেস্টিংয়ের সময় পানি ব্যবহার করা হয়। সিডিপিএলের দাবি, টেস্ট শেষে পাইপলাইন সম্পূর্ণ পানিশূন্য করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এত দীর্ঘ ও উঁচু-নিচু বাঁকযুক্ত পাইপলাইনে বাতাস চালনা করে সম্পূর্ণ পানি অপসারণ সম্ভব নয়। ফলে পাইপলাইনে আগে জমে থাকা সেই পানি পরবর্তী সময়ে তেলের সঙ্গে কুমিল্লা ডিপোয় প্রবেশ করেছে। এ কারণে কুমিল্লা ডিপোতেই প্রায় ৩৩ হাজার ৭৫৪ লিটার পানি পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরত-ই-ইলাহী চিঠি ও ক্ষতিপূরণের দাবির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে কোম্পানির শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, ৯ নভেম্বর সিডিপিএল প্রকল্প পরিচালক বরারর চিঠি দিয়ে কুমিল্লা ও ফতুল্লা ডিপোতে ঘাটতি ২ লাখ ২৩ হাজার ৭২০ লিটার তেলের মূল্য পরিশোধের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। যমুনা জ্বালানি পরিবহনে সিডিপিএলের নিয়ম মেনে পাম্প করেছে। এখন ডিপোতে সেই জ্বালানি অনেক কম পাওয়া গেছে। এর দায় তো যমুনা অয়েলের নয়।
যমুনা অয়েলের ক্ষতিপূরণের চিঠি প্রসঙ্গে বিপিসির পাইপলাইনে তেল সরবরাহের প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। যমুনা অয়েল ক্ষতিপূরণ নিয়ে সিডিপিএলকে কোনো চিঠি দিয়েছে কিনা আমার জানা নেই।’
সিডিপিএলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, সিডিপিএল মূলত পাইপলাইনের ট্রান্সমিশন অপারেটর। যেমন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট টাকা ট্রান্সফার করে কিন্তু অর্থের গন্তব্য নিয়ন্ত্রণ করে না, তেমনি তারা তেল পরিবহন করে, কিন্তু তেলের গুণগত মান বা পরিমাণ পরিবর্তনের সুযোগ নেই। যেটা পাম্প করা হয়, সেটা ডিপোগুলোয় চলে আসে। আবহাওয়ার গরম বা ঠাণ্ডার কারণে জ্বালানি কিছু কম-বেশি হতে পারে। এখন যমুনা অয়েল ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। সেটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে সেখানে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কিছুই করার নেই।
তবে সার্বিক প্রসঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ পাইপলাইনে এখন পরীক্ষামূলকভাবে জ্বালানি পরিবহন করা হচ্ছে। বিপিসি প্রকল্পটি এখনো বুঝে নেয়নি। পাইপলাইনের জ্বালানি পরিবহন হলে তাতে ঘাটতি হওয়ার বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ পাম্প করা ডিজেল বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ সেই। কিন্তু তারপরও ডিজেল কীভাবে কমলো বা আসলে কী হয়েছে সেটি তদন্ত প্রতিবেদন দেখলে বোঝা যাবে। খুব দ্রুতই তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে।’
২০১৬ সালে পাইপলাইনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি পরিবহনে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বিপিসি। ২০১৮ সালের অক্টোবরে একনেকে ‘চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা জ্বালানি তেল পরিবহনের পাইপলাইন নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর প্রকল্পটির কাজ শেষ হয় চলতি বছরের মার্চে। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা ধরা হলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায়। বিপিসির এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।
পাইপলাইনের দুটি অংশের মধ্যে একটি ২৪১ দশমিক ২৮ কিলোমিটার ১৬-ইঞ্চি ব্যাসের। এটি পতেঙ্গা থেকে ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো পর্যন্ত। আরেকটি ৮ দশমিক ২৯ কিলোমিটারের ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন, যা গোদনাইল থেকে ফতুল্লা ডিপো পর্যন্ত জ্বালানি পরিবহন করবে।